বর্তমানে সমাজে তরুন-তরুণীরা কেনো এতো বেশি হতাশায় ভুগছে

বর্তমান সমাজে হতাশা এক ভয়াবহ ব্যাধিতে রুপ নিয়েছে।
 করোনাকালে ভয়, বিষণ্নতা ও হতাশা গ্রাস করছে সবাইকে। সব কিছুতেই অনাস্থা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। যে হাত দিয়ে হয়েছে বিশ্বজয়, সে হাতকেই এখন সবচেয়ে বেশি ভয়। ধনী থেকে গরিব—সবার ভেতর ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। চারদিকে ভীতি ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্ঘুম রাত ও দুঃস্বপ্নের এক অসহনীয় যন্ত্রণা মনোজগেক কুরে কুরে খাচ্ছে।

মানুষ খুবই দুর্বল প্রাণী। অল্পতেই হতাশ হয়ে যায়। মহান আল্লাহ কোরআনে মানুষের চরিত্র সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এক জায়গায় তিনি বলেন, ‘আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর তাকে অনিষ্ট (বিপদ) স্পর্শ করলে সে একেবারে হতাশ হয়ে যায়।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৮৩)

সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না নিয়েই জীবন। কিন্তু একজন মুসলমান দুঃখের দিনে ভেঙে পড়ে না। মুমিন কখনো হতাশ হয় না। আশার আলো তার সামনে জ্বলে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘বলে দাও, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ—আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না...।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। সম্ভবত এর কারণ হলো, এসব মানুষ বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পায় না। সম্ভবত তাদের দৃষ্টিতে বিষণ্নতা ও বিপদাপদ মানেই সব কিছু শেষ! কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মুসলমানের সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। বিশ্বাসী মানুষ কখনো হতাশ হয় না। ইয়াকুব (আ.) তাঁর শিশুপুত্র ইউসুফ (আ.)-কে হারানোর বহু বছর পরও তাঁর মনে আশার আলো জ্বলে ছিল। তিনি তাঁর অন্য সন্তানদের বলেন, ‘হে আমরা পুত্ররা! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে না। কেননা অবিশ্বাসী সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৭)

সাধারণ মানুষ মনে করে, সহায়-সম্বল ও উপকরণ না থাকলে কোনো কিছু সম্ভব নয়। কিন্তু ঈমানদার বিশ্বাস করে, সহায়-সম্বল ও উপকরণ আল্লাহর দান। তিনি মৃত থেকে জীবিত ও জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তান হতো না। এ অবস্থায় তিনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন, কিন্তু তিনি হতাশ হননি। মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে সন্তান দান করেছেন, যখন তাঁর বয়স হয়েছিল ১০০ বছর এবং তাঁর স্ত্রীর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব—এ বিশ্বাস থেকে ঈমানদার বিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত হয় না।

মানুষ মনে করে, মাতা-পিতার কুশলী পরিচর্যায় সন্তান সোনার মানুষে পরিণত হয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন নজির অহরহ যে এতিম শিশুরাই একসময় বিশ্বে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছে। বর্তমান বিশ্বে তিনটি আসমানি ধর্ম প্রচলিত—ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি। এই তিন ধর্মের প্রবক্তারা হলেন মুহাম্মদ (সা.), ঈসা (আ.) ও মুসা (আ.)। তাঁরা কেউ পিতার পরিচর্যা পাননি। তবু তাঁরা বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন। অথচ তাঁদের প্রত্যেকে নিজ নিজ সময়ে হাজারো প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা হতাশ হননি।

পবিত্র কোরআনে এই তিন নবীর জীবনের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

কোরআনের একটি সুরার নাম সুরা লাইল। লাইল মানে রাত। এটি কোরআনের ৯২ নম্বর সুরা। এর পরের সুরার নাম সুরা দুহা। দুহা মানে পূর্বাহ্ন—দিন। এটি কোরআনের ৯৩ নম্বর সুরা। এর সহজ অর্থ হলো রাতের পরই দিন। হ্যাঁ, রাত যত গভীর হয়, প্রভাত তত কাছে। যার পেছনে যত অন্ধকার, তার সামনে তত আলো।

রাতের অন্ধকার পেরিয়ে প্রভাতেই রক্তিম সূর্যোদয় হয়।

বেদনাহত মনকে প্রশ্ন করুন, এমন কোন রাত আছে, যে রাতের পর সুপ্রভাত হয়নি?

মন খারাপের দিনে কোরআনের দুটি সুরা পাঠ করুন—সুরা দুহা ও সুরা ইনশিরাহ। সুরাগুলোতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু এই সম্বোধন সবার জন্য প্রযোজ্য। কল্পনা করুন, এসব কথা আপনাকে বলা হচ্ছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার জন্য পরবর্তী সময় আগের সময়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। অচিরেই তোমার রব তোমাকে অনুগ্রহ দান করবেন আর তুমি সন্তুষ্ট হবে। তিনি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পাননি? আর তোমাকে আশ্রয় দান করেননি? তিনি তোমাকে পেয়েছেন অনবহিত। অতঃপর তিনি পথের দিশা দিলেন। তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর তোমাকে ধনী (অভাবমুক্ত) বানিয়েছেন।’ (সুরা : দুহা, আয়াত : ৪-৮)

অন্য সুরায় আল্লাহ বলেন, ‘কষ্টের সঙ্গেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্যই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে।’ (সুরা : ইনশিরাহ, আয়াত : ৫-৬)


সুতরাং দুঃখের পর সুখ আসবেই। যদিও গন্তব্যস্থল অতীব কণ্টকাকীর্ণ এবং লক্ষ্য অনিশ্চিত, তবু জেনে রেখো, এমন কোনো রাস্তা নেই যার শেষ নেই। সুতরাং দুঃখ কোরো না। হতাশ হয়ো না।

আর মুমিনের জীবনে সব কিছু ইতিবাচক। মুমিন সুখের দিনে শুকরিয়া আদায় করে। দুঃখের দিনে ধৈর্য ধারণ করে। আল্লাহর কসম! একটি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান পাওয়া যাবে।


কাজেই কোনো অবস্থাতেই হতাশ হওয়া যাবে না। ভেঙে পড়লে চলবে না। আলো আসবেই। এই ঘোর আঁধার কেটে যাবেই, ইনশাআল্লাহ।

Post a Comment

0 Comments