অনলাইন ক্লাসে অতিরিক্ত খরচের বোঝা চেপেছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাঁধে

মনিপুর স্কুল ও কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক মাহমুদা খাতুন। সন্তানকে অনলাইনে ক্লাস করানোর জন্য বাসায় তাকে নিতে হয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। এর জন্য প্রতি মাসে তাকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৭০০ টাকা।



করোনা মহামারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেন বেশি ক্ষতি না হয়ে যায় তাই অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনলাইন ক্লাস চালু করেছে স্কুলটি।

ইন্টারনেট সংযোগের জন্য মাসিক ফি ছাড়াও রাউটার ও সংযোগ নেওয়ার সময় এককালীন তিন হাজার টাকা দিতে হয়েছিল মাহমুদা খাতুনকে। মোবাইলে ইন্টারনেট ডেটা প্যাকেজের তুলনায় ব্রডব্যান্ডে খরচ কম হয় বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘করোনার মধ্যে আমরা যখন সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছি, তখন এটা একটা বোঝা হিসেবে আমাদের কাঁধে চেপেছে।’

মাহমুদা খাতুনের কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবরিনা ইসলাম বন্যা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস করার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহার করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রী জানান, দুই দিন অনলাইনে ক্লাস করতে তার দুই থেকে তিন গিগাবাইট ডাটা প্রয়োজন হয়। এর জন্য তার খরচ পরে প্রায় ১১৪ টাকা।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্নাতকের এক শিক্ষার্থীও একই সমস্যায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি বেশি। এখন অনলাইন ক্লাস করতে গিয়ে পড়াশোনার খরচ বেড়ে আমাদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়ে গেছে।’

ক্লাসের জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের খরচ বেড়েছে, তা নয়। একই অবস্থা শিক্ষকদেরও।

মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে বাসায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হয়েছে ক্লাস নেওয়ার জন্য। একইসঙ্গে তাকে কিনতে হয়েছে হোয়াইট বোর্ডও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসের জন্য উচ্চমূল্যে ইন্টারনেট ডাটা কিনতে হচ্ছে। এটা অভিভাবকদের পাশাপাশি আমাদের ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।’

গত ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। এতে করে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী সরাসরি ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম।

বর্তমানে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস নিচ্ছে। তবুও, অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই এভাবে ক্লাস করাও সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস করা কঠিন।

খরচের বিষয়টি ছাড়াও মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগের গতি এখানে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। শহরাঞ্চলে মাঝারি মানের হলেও বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট না থাকায় এবং মোবাইল ইন্টারনেটের গতি খুবই কম থাকায় অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না।

সহনীয় খরচের ইন্টারনেট প্রত্যাশা

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের মোবাইল ইন্টারনেট প্যাকেজের জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

গত ১৫ জুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ইন্টারনেট প্যাকেজের দাবি জানিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে হওয়া বৈঠকে গত ২৫ জুন একই অনুরোধ জানিয়েছে বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা।

এর পাঁচ দিন পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি চিঠির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুবিধার্থে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউজিসি।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ জানান, অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্মার্টফোন কিনতে শিক্ষার্থীদের জন্য অনুদান বা সহজ শর্তে ঋণও চেয়েছে এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

চিঠিটির একটি অনুলিপি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং আইসিটি বিভাগেও পাঠানো হয়েছে।

গত ৬ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘মহামারির কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে, অনেক শিক্ষার্থীর জন্য ইন্টারনেটের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এক অনলাইন সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনাভাইরাস পরবর্তী মহামারির মধ্যেও অনলাইনে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

মোস্তফা জব্বার জানান, তারা টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ইন্টারনেট প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করছেন।

এই সপ্তাহের প্রথমদিকে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি শিগগির সুসংবাদ দিতে পারব। অপারেটররা নীতিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বাজারমূল্যের তুলনায় কম মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দিতে সম্মত হয়েছে।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) একটি টেলিকম অপারেটরের সঙ্গে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার চুক্তি করেছে। সেই উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও এমন করতে পারে।’

শাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, চুক্তি অনুযায়ী টেলিকম অপারেটর অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ২৫০ টাকায় ১৫ জিবি এবং ৪৫০ টাকায় ৩০ জিবি ডাটা সরবরাহ করছে।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পক্ষে এই টাকা পরিশোধ করবে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিটি বিভাগের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী জুলাইয়ের শেষের দিকে এই সুবিধা পাবে।’

চুক্তিটি আপাতত তিন মাস চলবে বলে যোগ করেন তিনি।

তবে, স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মোবাইল ডাটা পাওয়া কঠিন।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে সিম কার্ড কেনার জন্য বয়স হতে হবে ১৮ বছরের বেশি। সেক্ষেত্রে তাদের জন্য সবার কাছ থেকে একটি বিস্তৃত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে বলে জানান মন্ত্রী।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন জানান, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপর অনলাইন ক্লাসের আর্থিক বোঝা কমাতে তারা কাজ করছেন।

তবে, বিষয়টি নিয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Post a Comment

0 Comments