ছেলেদের ‘স্বপ্নদোষ দোষ‘ কেন হয়?

 ছেলেদের ‘স্বপ্নদোষ দোষ‘ কেন হয়?


আমাদের অনেকের মনে Wet Dream বা Nocturnal Emission বা স্বপ্নদোষ নিয়ে অনেক অজ্ঞতাভ্রান্ত ধারণা এবং এর ফলেঅহেতুক ভয় কাজ করে। কারো খুব বেশি বেশি স্বপ্নদোষ হয়। কারো বছরেও একবার হয়নাদুটো বিষয় নিয়েই ভুক্তভোগীরাহয়রানপেরেশানআজ স্বপ্নদোষ এর কারণ এবং তার প্রতিকার নিয়ে কিছু কমন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।



▪️ স্বপ্নদোষ কেন হয়?


এটা স্রষ্টা প্রদত্ত দেহের একটা ক্রিয়া। কোন রোগ বা পাপ নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বিষয়। একদমই ক্ষতিকর কিছু নয়। মেডিকেলসাইন্সের মতে এটা একটা নরমাল "ফিজিওলজিক্যালব্যাপার। মানে "সাধারণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া"... জ্বীঠিকই শুনেছেনএটা একটা "সাধারণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া"!


.


▪️ তাহলে কারো মাসে দু/একবারকারো ডেইলি একবারআবার কারো বছরে একবার কেন হয়?


আগেই বলেছি যেএটা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। আর সবার শারীরিক ক্রিয়া একরকম নয়। দেহের এনজাইম এবং হরমোনালএক্টিভিটিমেটাবলিজম এবং বায়োফিজিক্যাল ব্যাপার গুলো একেক জনে একেক রকম। যেমনকেউ বরফ চিবিয়ে খেয়ে ফেলেআবার কেউ ঠাণ্ডা পানি খেলেই টনসিল ফুলে যায় কারনেই কারো বছরে একবারকারো দৈনিক একবার করে স্বপ্নদোষ হলেওব্যাপারটা নিজ নিজ ক্ষেত্রে "নরমাল"



▪️ আমার কখনোই স্বপ্নদোষ হয়নিআমার একেবারেই স্বপ্নদোষ হয় না। এটা কেন?


স্বপ্নদোষ হওয়া যেমন স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়াতেমনি না হওয়াও একদমই স্বাভাবিক বিষয়। 


অন্ডকোষ কর্মক্ষম থাকলে প্রতি সেকেন্ডে ১১ হাজার শুক্রানু তৈরী হয়। সাথে বিভিন্ন গ্রন্থীর নিঃসরণ মিলে সৃষ্টি হয় বীর্য। বীর্যেথাকে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। সাধারণ অবস্থায় দরকারি উপাদান গুলো শরীর শোষণ করে নেয়। অবশিষ্টঅংশ "Phagocytosis" প্রক্রিয়ায় নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপরও যা বাকি থাকে তা স্বপ্ন দেখে বা স্বপ্ন দেখা ছাড়াই বের হয়ে আসে।কারো যদি বীর্যের উপাদান গুলো শরীরে শোষিত হওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ "Phagocytosis" প্রক্রিয়ায় ব্যালেন্স হয়ে যায়তাহলে তার আর স্বপ্নদোষ হবে না।


সুতরাংকারো প্রতিদিন স্বপ্নদোষ হওয়া যেমন তার জন্য স্বাভাবিক তেমনি কারো কখনোই স্বপ্নদোষ না হওয়া  নিজ নিজ ক্ষেত্রেস্বাভাবিক।


.


▪️ আগে তো এমন ছিলো নাএখন এত ঘন ঘন হয় কেন? / এখন আর হয়না কেন?


দেখুনআমাদের দেহ এক বিশাল সুপার কম্পিউটারের চেয়েও বেশি সফিস্টিকেইটেড সিস্টেম দিয়ে প্রোগ্রাম করা। এর প্রতিটাফাংশন একটার সাথে অন্যটা রিলেটেড। প্রতি মুহূর্তে দেহে হাজারটা বায়োকেমিক্যাল রিঅ্যাকশন হচ্ছেবায়োফিজিক্যালঅ্যাক্টিভিটি ঘটে যাচ্ছেস্নায়োবিক সিগনাল ট্রান্সডিউস হচ্ছে... এসবের সাথে নিবিড় সম্পর্ক আমাদের জীবনাচরণখাদ্যাভ্যাস পরিবেশের। এসবের কোনটার পরিবর্তন এর ফলেই এখন দেহের হরমোনাল আর মেটাবলিক ফাংশন চেঞ্জ হয়েছে। এখন নিজনিয়মেই এটা আবার ক্রমান্বয়ে আগের মত হয়ে যেতে পারে বা এর কম-বেশি করে বা একই রকম থেকে "সেটহয়ে যেতে পারেএই পরিবর্তনটাও "ফিজিওলজিক্যাল"


.


▪️ কিন্তুআমার যে ক্ষতি হচ্ছেশরীর ভেঙে যাচ্ছে। আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি!


সত্যি কথা বলতেগা ম্যাজম্যাজ করাদুর্বল দুর্বল লাগাকিছু মনে থাকে নাপড়ায় মন বসেনা ইত্যাদি সমস্যা গুলোস্বপ্নদোষের জন্য নয়। স্বপ্নদোষকে "দোষমনে করার জন্য। মানে "মানসিকযে বোঝা আপনি বয়ে বেড়াচ্ছেন তাই আপনারশান্তি কেড়ে নিচ্ছে। তবে হ্যাযদি পর্ণ আসক্তিহস্তমৈথুনবিকৃত যৌনাচার বা অনুরূপ বাজে অভ্যাসগুলো ছাড়া কেবল"স্বপ্নদোষহতে হতে শরীরের ওজন কমে যায়গাল-চাপা ভেঙে যায়চোখ গর্তে ঢুকে যায়দৃষ্টি ঝাপসা হয় তবে তা "স্বপ্নদোষএরজন্য না। অন্য কোন রোগের জন্য। এক্ষেত্রে আপনার "মেডিসিন স্পেশালিষ্টএর স্বরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।


আর যদি উপরোক্ত বাজে অভ্যাস থেকে থাকে তাহলে তো বুঝতেই পারছেনআগে এসব একদম বাদ দিতে হবে। বাদ মানেপুরোপুরি বাদ। আর একবারও করা যাবে না। এরপর বডির নিজস্ব ম্যাকানিজমে ঠিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ধৈর্যেরবিকল্প নেইবহুদিনের ক্ষয় রাতারাতি পূরন হয় না। মনে রাখবেন - একদিনে সব হয়নাতবে একদিন সব হবে।


.


▪️ স্বপ্নদোষ হতে হতে বীর্য একদম পাতলা হয়ে গেছেবিয়ে করতে ভয় পাচ্ছি!


আগে বুঝুনবীর্য আর শুক্রানু এক জিনিস নয়। বীর্য বা Semen  থাকে প্রস্টেট এর নিসৃত তরলসেমিনাল ভেসিকল নামকগ্লান্ডের নিঃসরণকাওপারস্ গ্লান্ড নামক গ্রন্থীর সিক্রেশনকেমিক্যাল পদার্থ যেমন ফ্রুক্টোজশ্বেত রক্ত কনিকা এবং শুক্রানু বাSperm.


অর্থাৎবেশিরভাগই তরল পদার্থসামান্য স্পার্ম (এই সামান্যই ৪০-৩০০ মিলিয়ন) আর স্পার্ম ম্যাচিউর হতেও একটা নির্দিষ্টপরিমাণ সময় লাগে। তার মানে বার বার স্বপ্নদোষ হয়ে বীর্য পাতলা হওয়া মানে হলশুক্রানু বা Sperm আসলে তেমন যাচ্ছেনাবাকি তরল অংশটাই বের হয়ে যাচ্ছে। এজন্যই মেডিকেল সাইন্স ব্যাপারটাকে "নরমালবলে।


আর বিয়ে করতে ভয় কিসেরবিয়ের পর বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বপ্নদোষ বন্ধ হয়ে যায় বা অনেক কমে যায়। তাহলে বাকিটেনশন স্পার্ম নিয়েআরে ভাইস্বামী-স্ত্রীর পবিত্র মিলন আর স্বপ্নদোষ কি একস্বাভাবিক মাত্রার মিলনপর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারআর স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইল অনুসরণ করুন। দেখবেন সব ঠিক। মনে রাখবেন ৪০ বা ৩০০ মিলিয়ন নয়সুস্থ - সচল একটাস্পার্মই প্রেগনেন্সির কারন হয়!


.


▪️ স্বপ্নদোষ হলে কি গুনাহ হবে?


না। তবে আপনি  অবস্থায় অপবিত্র। পরিপূর্ণভাবে গোসল (যেটাকে আমরা ফরজ গোসল বলে থাকিনা করলে আপনারসালাত আদায় হবে না। ফরজ গোসলের নিয়ম জানতে মুফতি মনসুরুল হক এর 'কিতাবুস সুন্নাহবইটি।



▪️ বুঝলাম ভাই। এটা রোগ নাতাই চিকিৎসাও নাই। কিন্তু মন তো মানেনাএটা কমানোর উপায় বলেন?


জ্বীএটা রোগ না। কিন্তু "অল্টার্ড ফিজিওলজি"! আর এর চিকিৎসা আছে। ভুলে গেলে চলবেনাচিকিৎসা মানেই "ঔষধনয়। লাইফ মোডিফিকেশন অ্যাডভাইসও চিকিৎসার অংশ!

.

আপনার চিকিৎসা  টা-

.

মানসিক  শারিরীক স্থিরতা আনুনঃ


এটাকে রোগ/পাপ/খারাপ কিছু ভাবা বাদ দিন। মানসিক ভাবে চাঙ্গা থাকুন।


যে কোন যৌন চিন্তাসেক্স ফ্যান্টাসিঅহেতুক উত্তেজনা পরিহার করুন।


দেহ মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত হয়এমন কাজ করবেন না।


সাধারণ Free Hand Exercise (ইনস্ট্রুমেন্ট ছাড়া খালি হাতে সাধারণ শরীরচর্চাকরুন। যেমনহাঁটাজগিংহাই স্টেপিংস্কোয়াটিংমাউন্টেইন ক্লাইম্বারপুশ আপপ্লাংক এসব। নিজের ক্ষমতা অনুযায়ীখুব বেশি ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত।

.

লাইফ স্টাইল বদলানঃ


টাইট পোশাক পড়বেন না। ঢিলে ঢালা জামা পড়ুন।


রাতে ঘুমানোর কমপক্ষে  ঘন্টা আগে খাওয়া  পানি পান শেষ করবেন।


ঘুমানোর আগে ভালো ভাবে প্রস্রাব করে ওজু করে ঘুমাবেন।


রাত জাগবেন না। উপুর হয়ে ঘুমাবেন না। কোল বালিশ ব্যবহার করবেন না। ভোরে উঠে যাবেন। একবার ঘুম ভাঙার পর"গড়াগড়িকরা একদম নিষেধ।


স্বপ্নদোষ হয়ে গেলে ভুলেও পর্ণ দেখবেন নামাস্টারবেট করবেন না। দ্রুত বিছানা ছেড়ে গোসল করে নিন। মন খারাপ করে শুয়েবসে থাকবেন না।


যেদিন স্বপ্নদোষ হবে সেদিন একটু সতর্ক থাকুন। বিছানা থেকে দূরে থাকবেন যতটুকু পারেনএকা অলস সময় কাটাবেন না।বাহিরে ঘোরাঘুরি করবেন। খেলাধুলা করবেন। ভালো বন্ধুবাবা মাভাইবোনদের সাথে সময় কাটাবেন।


কখনোই সম্পূর্ণ উলঙ্গ হবেন না। এমনকি গোসল বা টয়লেট   না। গোসল করার সময় বিশেষ করে লজ্জাস্থান ধোয়ার সময়খুব সাবধান থাকবেন।

.

পুষ্টিকর খাবার খেয়ে ক্ষয়পুরন করে ফেলুনঃ


দুধডিম  মাংস খাবেন।


কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখতে গুরুপাক খাবারতেল-চর্বিভাজাপোড়া বাদ দিবেন। পেপে সহ অন্যান্ন ফল  শাকসব্জি বেশি করেখাবেন।


কালোজিরামধুখেজুরভেজা ছোলাকিসমিসবাদাম নিয়ম করে খাবেন।


পর্যাপ্ত পানি পান করবেন। ইসুব গুলের ভূষি খাবেন।

.

বিশ্বাসের সাথে আমল করুনঃ


ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি পড়াসূরা ইখলাসফালাকনাস তিনবার করে পড়ে শরীর মাসেহ করাঘুমানোর দুআ অন্যান্য যিকর আযকার,গুলো করে হৃদয়টাকে ঠান্ডা করুন। অনেক ইফেক্টিভ।


বাথরুমগোসলখানায় প্রবেশ  বের হয়ে মাসনূন দোয়া পড়বেন।


ডান কাত হয়ে শোবেন।


আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমিন।


Post a Comment

0 Comments